আমার মা স্বনামধন্য বাংলা উপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার খুব ভক্ত। আমিও তারাশঙ্করের লেখা অনেক উপন্যাস পড়েছি। এছাড়া ওনার উপন্যাসের নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র দেখেছি।

সেবার বোলপুর যাওয়া উপলক্ষে মা তারাশঙ্করের বাস্তুভিটা দর্শনের ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল। ভাই যেহেতু চেম্বার করতে বীরভূমের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। ও বলেছিল যে তারাশঙ্করের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে ও ওর চেম্বারে যায়।

ঐ জায়গাটির নাম লাভপুর। লাভপুরে আরো একটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে সেটি হলো অট্টহাস বা ফুল্লরা সতীপীঠ। বোলপুর থেকে ফিরে আসার দিন সকালে সময় নষ্ট না করে আমরা জলখাবার না খেয়েই লাভপুরের উদ্দ্যেশে বেড়িয়ে পড়লাম। লাভপুর যেতে হলে আরো একটি সতীপীঠের উপর দিয়ে যেতে হয়। সেটি হলো কঙ্কালীতলা। চোল রাজাদের এই অঞ্চলে একসময় একটি সেনা শীবির ছিল। তখন এর নাম ছিল কাঞ্চি।

প্রথমে আমরা কঙ্কালীতলা পৌঁছে গেলাম। সতী পীঠ সংলগ্ন একটি জায়গায় গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। ওখানে মহাদেবের একটি মন্দির রয়েছে। এই মন্দির সম্ভবত ভৈরবের মন্দির। আগে ঐ মন্দিরটি সাদামাটা ইটের তৈরি ছিল। পরে এতে শ্বেত পাথর বসানো হয়েছে। এবং কিছু পরিবর্তন‌ও করা হয়েছে।

ঐ কমপ্লেক্স থেকে বাইরে রাস্তায় বের হয়ে বাম দিকে একটু এগোলেই কঙ্কালীতলা মন্দির প্রাঙ্গণের গেট দেখতে পাওয়া যায়। রাস্তার দুই পাশে পূজার ডালা কেনার অজস্র দোকান রয়েছে। সেই গেট দিয়ে ঢুকলে মন্দিরটি দেখা যায়। মন্দিরটি খুব‌ই সাদামাটা গোছের। এখানে কোন দেবী মূর্তি নেই বদলে শ্মশান কালীর একটি ফটো রয়েছে। এখানে দেবীর নাম দেবগর্ভা ও ভৈরব রুরু। কথিত আছে যে এখানে দক্ষযজ্ঞের পর সতীর কঙ্কাল পড়েছিল। এই সতীপীঠ গুলো সব অদ্ভুত। সব কটি সতীপীঠে এক বা একাধিক পাথর রয়েছে। যে গুলো সতী দেহাংশ নামে পরিচিত। আমার ধারণা এগুলো সব মহাজাগতিক প্রস্তর খন্ড বা এস্ট্রয়েড। সবগুলো সতী পীঠে পাওয়া প্রস্তরখন্ড একত্রিত করলে আন্দাজ করা যায় যে সতীর প্রকৃত আকার সম্পর্কে। আমি বিশ্বাস করি যে এই দেব দেবীরা কেউই পৃথিবীর প্রানী নয় বরং কোন মহাজাগতিক প্রানী বা এলিয়েন। দেখলাম মন্দির প্রাঙ্গণে অগনিত ভক্ত সারিবদ্ধভাবে পূজা দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের পক্ষে অতক্ষণ খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। আমি বা মা কেউই তেমন ধার্মিক ন‌ই। এবং কারোরই পূজা দেয়ার ব্যাপারে কোন আগ্ৰহ নেই। কঙ্কালীতলা মন্দিরের অনেক নাম শুনেছি, তাই দেখতে আসা। মন্দির দেখে আমরা বেরিয়ে এসে লাভপুরের উদ্দ্যেশে রওনা দিলাম।

লাভপুরের কাছাকাছি আসতে রাস্তার ধারে দেখলাম সব্জির বাজার বসেছে। শীতকালের তরতাজা সব্জি দেখে লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। দুই ব্যাগ ভর্তি করে বাজার করে নিলাম। যদিও আমাদের সল্টলেকের দামের তুলনায় খুব একটা যে কম এটা বলা যায় না। তারপর আবার লাভপুরের উদ্দ্যেশে এগিয়ে চললাম।

ফুল্লরা সতী পীঠটি লাভপুর শহরের বাইরে অবস্থিত। মন্দির কমপ্লেক্সটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এর পাশে একটা বড় মাঠ আছে যেখানে প্রতি বছর বিশাল মেলা বসে। একটি বড় গেট দিয়ে কমপ্লেক্সে ঢুকতে হয়। ঢুকে গাড়ি রাখার একটা অবিন্যস্ত জায়গা রয়েছে। আর তার পাশেই রয়েছে ফুল্লরা দেবীর মন্দির।

এখানে কোন দেবী মূর্তি নেই, বদলে রয়েছে সিঁদুর লেপা একটি বড় পাথর অনেকটা কচ্ছপ আকৃতির। এই মন্দিরে তেমন একটা ভিড় চোখে পড়েনি। আমি যারা পূজা দিচ্ছিল তাদের সরিয়ে মাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে মাকে দর্শন করালাম।

মন্দির প্রাঙ্গণে দেখলাম একাধিক বেড়াল বসে রয়েছে। অর্থাৎ এরা সম্ভবত মন্দিরে যে আমিষ ভোগ দেয়া হয় সেই ভোগের উচ্ছিষ্ট খায়। ফুল্লরা মন্দির থেকে সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িটি খুব একটা দূরে নয়।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে নোবেল পুরস্কার পেতেন। হয়তো নয় ওনার নোবেল পুরস্কার বিজয় পর্যন্ত ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যে বছর ওনার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কথা সেই বছরেই উনি মারা যান। ফলে মরনোত্তর নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় না, তাই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নোবেল পুরস্কার পাননি। আমাদের দূর্ভাগ্য যে উনি পেলে বাঙ্গালীদের নোবেল বিজয়ীর সংখ্যা আরো একটু বৃদ্ধি পেত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসত বাড়ি দর্শনের কথা লিখছি বলে এই ব্লগটি বাংলায় লেখা।

তারাশঙ্করের বাড়ি অবশ্য সবাই দেখতে পায় না। বদলে ওখানে একটি সংগ্ৰহশালা বা মিউজিয়াম তৈরী করা হয়েছে। ওনার একটি উপন্যাসের নামে নাম। ধাত্রী দেবতা, এটি আগে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়দের কাছারি বাড়ি ছিল। এটা জন্ম ভিটার উল্টো দিকে বেশ অনেকখানি জায়গা নিয়ে তৈরি। টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। টিকিট ঘরে ওনার লেখা বই এর একটি বিশাল সম্ভার রয়েছে।

মা ধাত্রী দেবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে

এর পাশে কাছারি বাড়িটি অবস্থিত। এখানে ওনার ব্যবহৃত আসবাব পত্র, জিনিস পত্র কতকগুলো ঘরে কাঁচের সোকেশে সাজানো রয়েছে। আর দেওয়ালে রয়েছে অগনিত ছবি এবং ফলক। যেখানে ওনার জীবন বৃত্তান্ত বিশদে বর্ননা করা রয়েছে। কাছারি বাড়িতে সম্ভবত একটা গেস্টহাউস রয়েছে।

ওখানে বেশ কিছু পর্যটক কে দেখতে পেলাম। যারা আমাদের মতো দর্শন করতে এসেছে। কথায় কথায় ওখানে একজনের সাথে আলাপ হলো। সেই লোকটি তারাশঙ্করের জন্ম ভিটায় থাকে। সেই আমাদের জন্ম ভিটা দেখাতে নিয়ে গেল। জন্ম ভিটা কাছারি বাড়ি থেকে হেঁটে উল্টো দিকে খানিকটা যেতে হয়। মায়ের বাতের সমস্যা তাই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু মা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত, তাই তাকে কোনমতেই নিরস্ত্র করা গেল না। ঐ বাড়িটি মাটির তৈরী। ওখানে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মেছিলেন। ওখানে যদিও দেখার বিশেষ কিছু নেই। যে ঘরে জন্মেছিলেন সেই ঘরটায় ওনার একটি ছবি রয়েছে। এছাড়া আর কিছু নেই।

কাছারি বাড়ি বা জন্মভিটা দুটোই খুব সরু রাস্তার ধারে তৈরি। জন্মভিটা টি একটি গলির ধারে অবস্থিত। পাশে অনেক গুলো গ্ৰাম্য মন্দির রয়েছে। বসত বাড়িতে ওনার ভাইপোরা থাকেন, ওনারা ওখানে একটি নতুন বাড়ি বানিয়েছেন। ওনার এক ভাইপোর সাথে কথা হলো। যিনি বেশ ভদ্র ও মিশুকে।

ওনার নিজের বংশধরেরা কোলকাতায় থাকেন। তারাই ওনার লেখার সত্ত্বের উত্তরসূরি। ইচ্ছে ছিল হাসুলি বাক দেখতে যাওয়ার। কিন্তু সময়ের অভাবে বোলপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হলো। গলির মুখ থেকে মা আর হাঁটতে পারছিল না তাই গলির মুখ থেকে একটা টোটোতে উঠলাম। আগে কখনো টোটোতে চড়িনি। মায়ের যদিও টোটোতে উঠতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। বোলপুর লজ থেকে আমরা চেক‌আউট করে নিয়েছিলাম। কলকাতায় ফেরার কথা ছিল বিকেলবেলা। তাই বোলপুরের ছুটি হলিডে রেসটে একটি রুম বুক করে রাখা ছিল, সেখানে গিয়ে উঠলাম।

দূপূরে মুরগির মাংস, ঝুরিঝুরি আলুভাজা, মুগের ডাল আর ভাত খেয়ে বাকি সময়টা কটেজের ঘরেই কাটালাম। রান্না বেশ ভালো। রেসর্টটি বাইরে থেকে এট্রাকটিভ দেখালেও ভিতরে খুবই সাদামাটা এবং তেমন কিছু দেখার নেই বদলে বড় বড় মশা রয়েছে। কটেজ গুলো জমি থেকে বেশ উঁচুতে। কিন্তু কোন ঘেরা বা রেলিং নেই। হঠাৎ কেউ ওপর থেকে পড়ে আঘাত প্রাপ্ত হতে পারে। নিচের জমিতে কোন বাগান নেই বদলে ইতস্ততঃ ঝাড় টাইপের বেমানান গাছ রয়েছে। রেস্টুরেন্ট টা বরং ভালো দেখতে, খুব সাধারণ জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো গোছানো।একটি সুইমিংপুল এবং লন থাকলে ভালো হতো। পরে জেনেছি ঐ রেসর্টটি আমার জাঠতুতো দিদির শ্বশুর বাড়ির কোন এক আত্মীয়ের। বিকেলে ভাই ফোন করার পর চেক আউট করে ভাইয়ের সাথে কলকাতার উদ্দেশ্যে র‌ওনা দিলাম।


Discover more from Forum: eStore

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Forum: eStore

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Discover more from Forum: eStore

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading